ধারাবাহিক গদ্য

 

              ধারাবাহি দ্য                        
  
  
সমর দেব 
 আমার যে দিন ভেসে গেছে


  ৩.

পোশাকি নাম পূর্ব গুড়িয়াহাটি উদ্বাস্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্তু আমাদের প্রাইমারি স্কুলের চালু নাম ছিল যদুবাবুর স্কুল। কয়েক কিলোমিটার ব্যাস জুড়ে যদুবাবুর স্কুলের নাম সকলের জানা। স্কুলে ভর্তি হবার পর থেকেই স্কুলটা আমার ভালো লেগে যায়। ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির স্কুলবাড়িটা। মেঝে পাকা হলেও দরমার বেড়া। সেই বেড়ার অনেক জায়গা ভেঙে হাতি ঢুকে পড়ার মতো উন্মুক্ত। স্কুলের ভেতরে গোটা তিনেক বিশাল আকৃতির বটগাছ, একটা পাকুড় গাছ। বটের ছায়ায় মনোরম পরিবেশ। গাছের ডালে ডালে নাম না জানা কত পাখি। স্কুলের দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা কী ভালো। আহা, মনে পড়লেই চোখে জল আসে। ভেসে যাওয়া সেই মধুর দিনগুলো আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না। প্রিয় দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা সম্ভবত কেউ আর বেঁচে নেই ! বকুল দিদিমণিকে অবশ্য বছর দশেক আগেও দেখেছি একদিন। বাকিরা কে কোথায়, জানব কী করে ! সময়ের সুদীর্ঘ স্রোত বয়ে গেছে কত কূল ছাপিয়ে। বুকের ভেতরে জমাট পাথরের মতো চেপে বসে আছে গোপন স্মৃতিরা। সেই বদ্ধ স্মৃতিদের মুক্তি দিতেই হবে, নইলে আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসবে। আমি যজ্ঞের পুরোহিতের মতো সেইসব মধুর স্মৃতিকে আহ্বান করি।  


সেই স্কুলের কত যে বন্ধু। ইস, কেন যে সকলের নাম, ঠিকানা লিখে রাখা হয়নি! এতদিনে অধিকাংশের নামই মনে নেই। কে কোথায় আছে তাও সামান্যই জানা। অনেকে এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। মনে আছে, আমার প্রাণের বন্ধু ছিল কাজল। আমারই মতো, রোগা, দুর্বল। মনে আছে দুলাল, নিরঞ্জন, স্বপ্নাদের কথা। নিরঞ্জন আমার কাছাকাছি বয়সী। ওর খুড়তুতো বা জেঠতুতো দাদা দুলাল, বয়সে বেশ খানিকটা বড়। নিরঞ্জনের দিদি স্বপ্না, অনেক বড়। আমাকে ভাই বলে ডাকত। একই ক্লাসে পড়লে কী হবে, রীতিমতো দেখে শুনে রাখত। ধমক ধামকও করত। বাড়ি থেকে এটা সেটা নিয়ে এসে চুপি চুপি আমাকে দিত। কখনও বাদাম ভাজা, কখনও ‘হরবড়ই’ (দেখতে অনেকটা আমলকির মতো, হাল্কা সবুজ রং, টক-মিষ্টি স্বাদ), কখনও ‘ডাউয়া’। ‘ডাউয়া’ দেখতে চোবড়ানো, হলুদ রঙের, খসখসে একটা ফল। এটা খাওয়া যায় না। আমরা স্লেট মুছতে ব্যবহার করতাম। ওদের বাড়িতে গাছ ছিল। এই ‘ডাউয়া’ নিয়ে ক্লাসে প্রায়ই মারপিটের উপক্রম হতো। আমার কাছ থেকে কেউ ‘ডাউয়া’ কেড়ে নিলে ফের কোত্থেকে আরেকটা ‘ডাউয়া’ আমাকে এনে দিত স্বপ্না। একদিন ছুটির পর ওরা তিন ভাইবোন আমাকে নানাভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, প্রায় টানতে টানতে ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। ওদের বাড়িটা ছিল সামান্য দূরে। তখন চেনার প্রশ্নই ছিল না। এখন বুঝি, জায়গাটা বেলতলা ক্লাবের পাশের রাস্তায় খানিকটা গিয়ে ডানদিকে। বাঁদিকে বিশাল ড্রেন, সকলে বলত মিউনিসিপ্যালিটির নর্দমা। সেখানে সারা বছর কুলকুল করে বয়ে যেত জলস্রোত। নর্দমা বলতে যেরকম পুতিগন্ধময়, নোংরা কালো জলের অবরুদ্ধ সরু নালা বুঝি সেরকম ছিল না। বর্ষার সময় সেই নর্দমা ছোটখাটো নদীর চেহারা নিত। প্রবল বেগে বয়ে যেত জল। তার পাশে অনেক মানুষ মাছ ধরত। কেউ বঁড়শি ফেলে, কেউ জাল পেতে মাছ ধরত। যেদিন আমাকে ওরা ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন অবশ্য নর্দমায় তেমন জল ছিল না। সময়টা শীতকাল। আমার খুব শীত করছিল। গায়ে একটা সাধারণ জামা। হাফ প্যান্টে পায়ের অনেকটাই উন্মুক্ত। খালি পা, ধূলিধুসরিত, হাঁটু অবধি। আমাদের পা সব সময়ই খালি থাকত। জুতো পরার প্রয়োজনীয়তা ছিল না, সম্ভবও ছিল না। প্রাইমারি স্কুলে কোনো একবার অজন্তা হাওয়াই জুটেছিল। তো, সেই হাওয়াই পায়ে থাকত কম, প্রতিটি পদক্ষেপে হয় ডান পা নতুবা বাঁ পায়ের হাওয়াই সামনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া আমাদের খেলা ছিল। ক্লাস ওয়ানে পড়ি, সেদিন শ্যামা স্কুলে আসেনি। সেটাই বোধহয় সুযোগ ছিল। তেমন জোরালো আপত্তিও করিনি। নিরঞ্জন, স্বপ্না, দুলাল তিনজনে প্রায় জোর করে আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেলে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল না তেমন। বরং, ওরা ভাই-বোন এটা সেটা কথা বলছিল টুকরো টুকরো। আর, আমি অবাক বিস্ময়ে চারপাশ দেখছিলাম। আমার জীবনের পরিধি বাড়ির সীমানার বাইরে সম্পূর্ণ অচেনা। বাড়ির চিরপরিচিত গাছপালা, ঘরদোর, সামান্য আসবাব, কিছু বইপত্র, আর পোকামাকড়, হলুদ রঙের একটা ছাগল, এরকম আমার পৃথিবী। সে পৃথিবী যে ভূগোলক সেটা বুঝতে জীবনের অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে ওরা তিন ভাই-বোন এমন একটা বাড়ির উঠোনে এনে দাঁড় করালো যেখানে উঠোনের চারপাশে বিরাট বিরাট চারটে ঘর। প্রতিটি ঘরের সামনে বারান্দা। উঠোন থেকে ফুট দুয়েক উঁচু মাটির মেঝে। প্রতিটি ঘরের দেওয়ালে টিনের বেড়া। ওপরে টিনের ছাউনি। বাড়িতে তেমন কাউকেই নজরে পড়েনি। মাটির দুই ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে ঘরে টেনে নিয়ে গেল স্বপ্না। তারপর ঘরের একেবারে মাঝখানে একটা বিশাল আকারের পিঁড়ি পেতে বলল, বস। আমি বাধ্য ছেলের মতো তার নির্দেশ পালন করলাম। ইতিমধ্যেই নিরঞ্জন আর দুলাল কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে। চারপাশে তাকিয়ে কাউকেই দেখছি না। একজন মাঝবয়সী মহিলা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখছিলেন, আর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছিলেন! কেন, আমি জানি না, আজও। তিনি বললেন, তোমার নাম কী? আমি নাম বলার পর তিনি বললেন, বসো। বাইরে দরজার কাছে বেশ কয়েকজন উঁকিঝুঁকি করছে বুঝতে পারছি। সামনে আসছে না কেউ। তাদের মধ্যে ফিসফিস করে কিছু কথা হচ্ছে, টের পাচ্ছি। খুব অস্বস্তি হচ্ছে আমার। পালাতেও পারছি না। রাস্তাই চিনি না। বিপদে পড়ে আমার কান্না পাচ্ছে। এমন সময় ঘরে ঢুকল স্বপ্না। হাতে কাঁসা বা পেতলের একটা জামবাটি। আমার সামনে জামবাটিটা রেখে সে বলল, খেয়ে নে। বাটিতে বোঝাই মুড়ি আর তার ঠিক মাঝখানে একটি খোসা ছাড়ানো বিরাট সাইজের কলা খাড়াভাবে গুঁজে রাখা। আমি বুঝতে পারছি না কী করা উচিত। মিনমিন করে বললাম, বাড়ি যাব। স্বপ্না বলল, আমরা বাড়িতে রেখে আসব। তুই খা তো। একই ক্লাসের পড়ুয়া, অথচ তার এই অযাচিত স্নেহ আজও আমাকে আপ্লুত করে। জানি না সে এখন কোথায়, কেমন আছে। খুব মনে পড়ে। সেই শৈশবে আমার জীবনে তার ভূমিকা মনে পড়ে। তার স্নেহচ্ছায়া আমাকে প্রাইমারি স্কুলের জীবনে কত যে ছায়া দিয়েছে ভাবলে কৃতজ্ঞতা বোধ করি। কত বিপদ থেকে সে আমাকে উদ্ধার করেছে। এখন মনে হয় আমার চেয়ে বয়সে বোধহয় সে বছর দশেকের বড় ছিল। তবু, কী এমন বয়স, বছর চোদ্দর আশপাশে। এই পরিণত বয়সে বুঝি তখন সেও নেহাতই বালিকাই ছিল। তবু কেন যে আমার প্রতি তার এই স্নেহ ঝরে পড়ত। সেটা কী চিরকালীন মেয়েদের সম্পর্কে যেমন ধারণা করা হয়, সেই নারী জাতির বৈশিষ্ট্য, মায়ের জাত বলে ? তাকে তো তখনও মোটেই নারী বলা যায় না। বড় জোর কিশোরী। তার নিজেরই ছোট ভাই নিরঞ্জন। সেও আমার চেয়ে সামান্য বড়। ফলে, আলাদা করে আমাকে ছোট ভাইয়ের স্থান দেবার কোনো গূঢ়ার্থ থাকতে পারে না। তবু, তার কাছে এত স্নেহ পেয়েছি যে দীর্ঘকাল তার সেই কৈশোরের মুখাবয়ব স্পষ্ট মনে ছিল। হায়, এখন পরিণত বয়সে তার মুখটা আর মনে করতে পারি না !  নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। ক্লাসের সেরা ছাত্র হিসেবে হয়ত আমাকে তার ভালো লেগেছিল, তা থেকেই হয়ত এই স্নেহ। কিন্তু, এখন বুঝি, যদুবাবুর স্কুলের ক্লাস ওয়ানের ছেলেটি তেমন ভালো ছাত্র ছিল না মোটেই। তাছাড়া, সরকারি সেই প্রাইমারি স্কুলটি আমার জীবনে শিক্ষাগত ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। পারার কথাও নয়। স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল দেশভাগের পর উদ্বাস্তু শিশুদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য, এরকম একটি স্কুলের বাস্তবিকই চরম দুর্দশা। আশপাশের হতদরিদ্র, নিরক্ষর অথবা নেহাতই স্বাক্ষর এমন পরিবারের শিশুদের পড়ার জায়গা ছিল। পরবর্তীতে কতটা কী হয়েছে জানি না, কিন্তু তখন অবধি এই স্কুলের কোনো বিশিষ্ট প্রাক্তনীর খোঁজ মেলার কথা নয়। তো, এমন একটি স্কুলের ক্লাস ওয়ানের সেরা ছাত্র যে আসলে তিনজনের মধ্যে তৃতীয়ের বেশি কিছু নয়, সেটা আজকের বালকও বোঝে। ফলে, আমাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা মতো কোনো ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আমার প্রাপ্তি ছিল বিরাট।


আমার খাওয়া শেষ হলে ফের নিরঞ্জন আর দুলালের আবির্ভাব। আমার মুখে তখন কান্নার ভাব। স্বপ্না আমাকে বলল, চল, আমরা তোকে বাড়ি দিয়ে আসব। সত্যিই ওরা তিনজনে আমার সঙ্গে এসে একেবারে বাড়িতে পৌঁছে দিল। আমার তখন আতঙ্কে শিড়দাঁড়া দিয়ে বরফের স্রোত নামছে। ঘরে ঢুকে বইখাতা রেখে, বিছানার একপাশে চুপ করে বসে বেদম মারের অপেক্ষা করছি। মায়ের সঙ্গে কিছু কথা বলে ওরা চলে গেল। মা কিন্তু আমাকে কিছুই বলল না। মারল না। শুধু বলল, আমি চিন্তা করছিলাম। সেদিন বিকেল গড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমার বিকেলের খেলা আর হলো না। এখন বাড়ির ওপাশের মাঠে আর কেউ নেই। সেখানে আবছায়ায় কেমন রহস্য দানা বেঁধে আছে। মা বলল, যা হাত-পা ধুয়ে পড়তে বস। আমি স্বস্তি পেয়ে কলতলায় গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে হাত-পা ধুয়ে, মুখে ভালো করে জল দিয়ে দৌড়ে বারান্দায় এসে দড়িতে ঝোলানো গামছা টেনে নিই। ওদিকে, বিছানায় একটা হ্যারিকেনের চারপাশে গোল হয়ে বসে তারস্বরে পড়তে শুরু করেছে শ্যামা, ভাই (আরেক দাদা), এক দিদি। আমার জায়গাটা তখনও খালি। ওদিকে, আরেকটা হ্যারিকেনের আলোয় বাদলদা, সেজদি, মেজদি। আরও কেউ কি ছিল সেখানে? মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে হ্যারিকেন ঘিরে গোল হয়ে বসে তারস্বরে পড়া মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা। সেই নীরব প্রতিযোগিতায় কোনো হারজিত নেই, কোনো প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নেই। শুধু বড়দের কাছে নিজেকে মনোযোগী প্রমাণের প্রাণান্তকর ব্যর্থ চেষ্টা। আর, সেই চেষ্টায় আমি চিরকাল ফেল মেরেছি ! 


মর দেব
               জন্মঃ ১৯৬৩ সালের ১ নভেম্বর, কোচবিহারে। সাংবাদিকতার পেশা সূত্রে গুয়াহাটিতে বাস করেন ।  কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ২০১৫ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে সমর দেবের 'আলো অন্ধকার' কাব্যগ্রন্থের কবিতা ইংরেজি অনুবাদে পেশ করে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মন্তব্যঃ ‘ইউরোপ-আমেরিকা শিখুক এই বাঙালি কবির কাছে’। কথাশিল্পী সমর দেবের উপন্যাস অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি, অসম সরকার কর্তৃক ভাষা গৌরব সম্মাননা লাভ করেছেন। 

তাঁর প্রথম উপন্যাস পরিপ্রেক্ষিত, ১৯৮১ সালে লেখা এবং শিলিগুড়ির অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রবিশ্ব পত্রিকায় ১৯৮৬ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত। প্রথম কাব্যগ্রন্থ যযাতি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তালিকায় রয়েছে প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'যযাতি' ছাড়াও এক যুগ আত্মপ্রতারণা (উপন্যাস), একটি গল্পের সুলুক সন্ধান (উপন্যাস), লঙ্কাবরের উমেশ মাঝি (উপন্যাস), নীল অন্ধকার (উপন্যাস), লোহিতপারের উপকথা (উপন্যাস), আম্মা তেরা মুন্ডা (কাব্যগ্রন্থ), আলো অন্ধকার (কাব্যগ্রন্থ), বহুদর্শী কাক ও অন্যান্য কবিতা (কাব্যগ্রন্থ) এবং একমাত্র প্রবন্ধ সংকলন অমৃতযাত্রা।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চা- পাতা ৯৩

চা-পাতা ৯১

চা- পাতা ৯২