চা-পাতা ৯১

 





    সময় বদলাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে আর এই বদলানোটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু পরিবর্তন এমন হুট করে ঘটে যার সাথে মানিয়ে নেওয়া খুব মুশকিল হয়ে যায় । লকডাউন পরবর্তী সময়ে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি । কোভিড পূর্ববর্তী সময়ের সাথে এখনকার সময়ের বিশাল ফারাক । অনেক নতুন নতুন শব্দ, শব্দের সাথে রাজনীতি এসে জীবনটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেছে । জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া । মানুষের হাতে টাকা নেই । তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে তো গেছেই । কোন প্রকার কমা দিয়েই থামানো যাচ্ছে না। চাকরির বদলে সবাইকে লক্ষ্মীনারায়ণ সাজিয়ে ভাতা দেওয়া হচ্ছে । ভাতের থালার সাথেও আধার লিঙ্ক করিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি সুষম খাদ্যের জন্য । ভগবান মন্দির ছেড়ে বুর্জ খলিফায় বসে কি ভাবছেন সেটাই এখন দেখার বিষয় ।



মা নি ক   সা হা

নৈঃশব্দ্যগামী

সেও এক আষাঢ় মাসের দিন। বাবা বৃষ্টি ভেজা হয়ে বাজার থেকে ফিরছেন। সাদা ধুতি 
পাঞ্জাবীতে তিনি এক মায়াবী মানুষ।

টালি ছাওয়া রান্না ঘর। মাটির মেঝেতে বসে দুধ ভাত খাই। আমাদের চাহিদা ছোট ও 
নরম । বাবারও তাই। খুব বড় কোন স্বপ্ন তাঁর কোনকালেই ছিলনা।

দুধ-ভাতের বাটি থেকে মুখ তোলে অনন্ত শৈশব। মারোয়ারী বন্ধু মনোরম লাল সাইকেল 
চালিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায়।

কথা ছিল মাধ্যমিকের পর সাইকেল আসবে ডানা মেলে। নতুন সাইকেলে সারা দিনহাটা 
শহর ঘুরবো৷ আনাচ-কানাচ ঘুরবো। খারাপ পাড়ার ভেতর দিয়ে সাঁ  করে বেড়িয়ে যাবে 
নির্জন দুপুর। 

আমার স্বপ্নগুলো মায়াবী বাবার মতো, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া। তারাও লুকিয়ে কাঁদে। 
মাঝে মাঝে আর্তনাদ।

এতটাই নগণ্য তারা, এতটাই নৈঃশব্দ্যগামী - তারা যদি ভেঙে যায়, কেউ তার আভাসও 
বোঝেনা।


দুটি কবিতা
অ ঞ্জ ন   দা স

পুরুষ নদী 

রং ছবিতে কুঁড়ির ভেতর ফুল আঁকোনি
গানের ভেতর মন লেখোনি গায়ক পাখি
ভাত পড়েছি খিদের ভেতর রাত পড়িনি
কেউ ফেরেনা ফিরেই যদি চিনতে পারো 

ফিরেই যদি চিনতে পারো কেউ ফেরেনি
কেয়ার বিহিন বছর কুড়ি সেই রয়েছে
যার অহমে  পুড়িয়ে ছিলে পুরুষ নদী
শ্রেষ্ঠ দেহের আগুন নেশায় চাইবে তাকে

শরীর  বিহীন দাও কী পাথর কাতর বাঁশি
বন ভুলিয়া খাঁচা পাখির প্রেম শিখে যাই
ত্যাগের ভারত শক্তিশেলে সীতা'ই জানি 
রং ছবিতে কুঁড়ির ভেতর ফুল আঁকোনি


মৃত্যু
 
লজ্জা খুলে যে শরীর ফেলেছো সেতার
পাতার বক্ষজলে পৃথিবী মন্থন
দৃশ্য তলিয়ে দেখি গভীরে সাঁতার
জাগতিক অমরতা -সেলাই পার্বণ

শিখাহীন সেতারের পাথেয় কঙ্কাল
কার্বন চুরি গেলে হত্যার আগুনে
গ্রামার ছিঁড়ে দেয় ভূগোল কিশোরী
আততায়ী শিক্ষক রং ঢালে বনে

বারান্দা খুললেই পৃথিবী প্রস্তুতি
কানে ও কবিতা ঝোলে ছবি শব্দ হয়
বিনিময় প্রথা ভেঙে কে লিখেছে নদী
আমি আছি আমি নেই তুলে নিয়ো জয়


শু ভ দী প   আ ই চ
কুয়াশা যাপন

নুড়ি-ভোর
উন্মুক্ত ঊরু
আমাদের দ্রাবিড় প্রাঙ্গনে লেখা ছিল আদিম রূপকথা
জন্ম-ভোর এক দ্রাব্য আবেগ
মিশে যাওয়া আত্মার কোলাহল
বিলুপ্ত পথ
চারাগাছ
নারীজন্ম
দ্রোহের মাঝখানে নিবিড় শোকগাথা
অদ্ভুত লোককথা ভাসে বাউল কপালে

নির্বিঘ্ন মেঘ অস্তিত্বহীন মুদ্রাদোষ
পুষ্প সৌন্দর্য লুটিয়ে বাগানে
হাজার ধূলার পথ শেষে উড়ান উন্নত হয়
ভেক ছিড়ে আসে
জটিল থেকে খসে পড়ে গঙ্গা
মুখোশ খুলে আসে পশুদের আর
দাঁত-নখ মুখে উড়ে আসে পাখিরা

এ আগুন জ্বলছে জ্বলুক
নিবিড় অভ্যাসে লেখা হোক মাইলফলক
পোড়া হাত জন্ম দিক মেধা-কুসুম
উল্লাস উড়ে আসুক অসুখী আঁচলে


ক ম ল   স র কা র
একটা রাস্তার জন্য

মানুষের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া
বিভ্রান্ত আমি
একটা রাস্তা খুঁজছি
যে রাস্তা আমাকে সমস্ত আগাছার জঞ্জাল পেরিয়ে পৌঁছে দেবে
সোনালি ধানের খেতে,

অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর অবশ হয়ে আসা হাত-পা
আর অন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ নিয়ে আমি
একটা রাস্তা হাতড়ে যাচ্ছি
আমাকে যা নিয়ে যাবে একটা আলো-ঝলোমল
খোলা আকাশের প্রান্তে।

একটা রাস্তা —
কারখানার শেড থেকে বেরিয়ে
স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, চালের গোডাউন, ইঁটভাটা হয়ে
চলে যাচ্ছে ইস্কুলের গেটে,
কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্লাস থেকে বেরোনো
যে-রাস্তার বাঁকে বাঁকে আছে খয়েরি খামের স্তূপ;

এমন একটা রাস্তা
যে রাস্তায় কোনো মন্দিরের পুরোহিত তার
স্বভাবসিদ্ধ অভয়মুদ্রাটি অক্ষুণ্ণ রেখে
সটান কোনো মসজিদের ভেতরে চলে গিয়ে বলে দিতে পারে,
"চিন্তা কোরো না ইয়াকুব!
মায়ের কাছে মানত করে এলাম —
তোমার ছেলে শিগগিরই সেরে উঠবে" ;

ছবির মতো আঁকা
এমন একটা রাস্তা
যে-রাস্তায় পকেটে গোলাপ নিয়ে
রুকসানার দিকে নির্ভীক হেঁটে যায় অনিমেষ,
মুখ থেকে বোরখা সরিয়ে
লাজুক বিনয়কে দুরন্ত চুমু খেয়ে ফেলে তাবাস্সুম!

কোনো ঈশ্বর আল্লা নয়
কোনো মহামানবও নয়
এমনকি সরকার বা রাষ্ট্রও নয়,
শুধু স্বেচ্ছাশ্রমে এমন একটা রাস্তা গড়ে নিতে পারবে—

এই অপার জন-অরণ্যে আমি
সেইসব মানুষ খুঁজে চলেছি।


শি ঞ্জ ন   গো স্বা মী

চুম্বক

তুমি জলাশয়ে জেগেছো শরীর
            জলে তো মেটেনি তেষ্টা
ভাঙা  শিরদাঁড়া, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
কাঁটাতার, স্মৃতি, গুলাগ পেরিয়ে যাচ্ছে
রক্তে সজাগ মায়াচুম্বক ডাকছে
আমার শতক ফিরে তাকাচ্ছে শেষবার

সে দ্যাখে এখনো আগুনের সন্ধানে
কারা ছুটে যায় উন্মাদ উদ্যানে
যাদুঘরে, শীতে, পাথরে জাগায় প্রাণ
যেটুকু শরীর এখনো প্রবহমান

সেটুকু গভীর, স্পন্দিত জলাশয়
আগলে রেখেছে আগামীর সঞ্চয়
বিগতের ছায়া তোমাকে শত্রু ভাবছে
রক্তে সজাগ মায়াচুম্বক ডাকছে

স ম্পি তা   সা হা
অতঃপর

যাদের ফেরাতে পারিনি, তারা ছায়া হয়ে গেছে।

কতদিন এমন হয়েছে যে কথা ভাঙাতে গিয়ে বুঝেছি গুঁড়ো শব্দদের যা স্বাদ হয় তা দিয়ে রান্নাঘর চলবে না বরং দু'একটা সামান্য গিলে নেওয়ায় কিছুটা  ওজন হয়ত কাউকেই ফালতু বইতে হবে না!

সচরাচর আমরা কেউই তো আর মনে করি না। কোনো ধারাবাহিকতাও নেই। তোমার জন্য যারা তখনো ছিলো, তারা এখনো আছে শীত গ্রীষ্মে। তুমি সেই বহুকাল আগে থেকে গেয়ে আসা গানের মতো। চোখ বুজলেও যার সুর মসৃণ ঘুম ভেদ করে ছড়িয়ে যায় মাথার পাশে!

দূরত্ব পুষছি যত্ন করে। এলে উৎসবের দিনে এসো। ভিড়ে দাঁড়ালে, দূরবর্তী সম্পর্কে দ্বিধা কম হয়।


সৌ র দী প   ব র্দ্ধ ন
অনুনাদ

আমাদের অস্থি পাঁজর হাড়ের ভেতরে থাকা বিষন্নতার কোনো নাম নেই

প্রতিদিন নতুন করে স্বপ্ন দেখা হৃদয়, অট্টহাস্যে লুকোয় দাগ।
ধুঁকতে থাকা সময় মাটিতে একরাশ আশা নিয়ে শোয়।
মাটি কাউকে ফেরায় না,মিলিয়ে দেয় অমরত্বে।


চা-পাতা

তৃতীয় বর্ষ । সংখ্যা ৯১

প্রচ্ছদ - দেবমিত্রা চৌধুরী 

সম্পাদক - তাপস দাস



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চা- পাতা ৯২

চা পাতা ৯০