শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২০

 


দেবজ্যোতি রায় 

নাঃ, নেই, যা



সবে সন্ধ্যা ৭ টা। আজ একটু তাড়াতাড়ি কুয়াশা পড়তে, শীতটা এবারে জাঁকিয়ে নামবে মনে হচ্ছে। আমি আনমনে রাস্তা দিয়ে...রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান, বাপির দোকানে কেউ আর আজকে আসবে মনে হচ্ছে না। এর চেয়ে বাড়ি ফিরে ছিপি খুলে, আমার পা আমাকে বাড়ির দিকে টানতে শুরু করল। পথবাতিগুলোকেও বেশ ম্যাড়মেড়ে। কুয়াশার ভেতর একবার ঢুকে যাচ্ছি, পরমুহূর্তেই দূরে সরে যাচ্ছে, যেন আলিঙ্গন ও বিচ্ছেদ দুটোই সমানতালে। ছিপি ডাকছে। বলছে এস, খোলো, পান করে জমাও এ শীতরাত্র। তারপর রাত্রির শরীর থেকে সবটুকু, ওকে জড়িয়ে খাটে নিদ্রা যাও। এটুকুই তো জীবন কালীপ্রসন্ন ! আমি বিয়ে করিনি। শরীর জাগতে চাইলে নিরাময়ের ভিন্ন রাস্তা খোলা আছে। কে আর হৃদয় খুলে সংসারে জড়াতে চায় ! আমি অন্তত নই। সংসারের শুভ দিনের আয়ু তো মাত্র একবছর। তারপর যা পড়ে থাকে সেসব আর বলতে ! পারস্পরিক দোষারোপ, কে কাকে কতটা ঠকিয়েছে, ইত্যাদি। অবশ্য সন্তানের কপালে চুমু খাবার ইচ্ছে যে জাগে না তা নয়। আমি তাকে কষ্টে মেলাই। এই ভাল, এই বেশ আছি। 

চোখে মায়া মায়া দেখছি। যেমন আমরা বলি ছপ্পড় ফারকে, তারই বিপরীতে এক্ষেhত্রে ভূমি ফারকে, মানে মাটি ফুঁড়ে, হঠাৎই আমাকে ঘিরে কুয়াশা এবং তারই মধ্যে আমি তখন স্ট্যান্ডস্টিল, নট নড়ন-চড়ন, ন যযৌ ন তস্থৌ, কিংকর্তব্যবিমুঢ়, ঘেঁটে ঘ, ভূতের মত চেহারার ,এলোমেলো উস্কোখুস্কো কাঁচাপাকা চুল একমাথা, মুখে খোঁচাখোচা পাকা দাড়ি, সাকুল্যে এক বিঘৎখানেক বলা যেতে পারে, পরনে নীল জিন্সের শতচ্ছিন্ন ময়লা প্যান্ট, ছেঁড়া ময়লা একটা মনে হল সাদা শার্ট, হাতে একটা মনে হল ধারালোই হবে---দা, আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে বলল লোকটা। 

রাস্তায় ওই শীতেলু কুয়াশায় ঘেরা নির্জনতায় আমি শুধু কাঁপতে কাঁপতে বেতস পাতার মত, বলতে পারলাম, ক্যা ক্যা কেন ? স্পাইনাল কর্ডটি দিয়ে আরও বেশি শীতল তখন অথচ আমি বোধহয় ঘামছিলামও ওই শীতের সন্ধ্যায়। আমার কিছুই ওরকম আচমকায় করার ছিল না। 
বলছি না ঘুরে দাঁড়া, ধমক,জোরে। 
উর্ধ্বে যে কয় পুরুষের নাম তন্মুহূর্তে মনে আসে, জপতে জপতে, আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস কোনকালেই ছিল না, যদিও চূড়ান্ত অবিশ্বাসীরও ওসব মুহূর্তে, কিন্তু আমি উর্ধ্বের পুরুষগণেই, ঘুরে দাঁড়ালে লোকটা স্পষ্ট গলায় কেটে কেটে বলল, নাঃ, নেই,যা। 

কী নেই, কেন নেই, কী থাকার ছিল, কী দেখল লোকটা আমার পেছনে, কোথাও হাত দেয়নি, পকেটে স্পার্সও তো ছিল, পেছন পকেটে, সেখানেও না,ঘাড়ের মসৃণ, কতটা, তাও দেখেনি, শুধু --- নাঃ, নেই, যা-টুকু ছাড়া। কৈফিয়ত চাইবার মত লিঙ্গের জোর কোনকালেই ছিল না বলে, আর এখন তো সে প্রশ্নই ওঠে না, আমি চোঁ-চা, নিশ্বাস ফেললাম এতক্ষণ পরে, বাড়িতে এসে। তবে কাউকেই কিছু বলিনিটি,পরেও। নিজেই তো বুঝতে লারছি ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন, সন্ধ্যাকাশ ছিল কুয়াশায় মোড়া। 

কিন্তু আমি চেপে থাকলেও চেপে যাবারই-বা কে ! দিন চারেক পরে সকালের কাগজে যেরকমটা এতক্ষণ বললাম, একটা ওরকম লোক, নির্জন রাস্তায়, শহরের অনেককেই নাকি, ওরকম মাটি ফুঁড়ে, এবং নাঃ, নেই, যা-র বিস্তারিত প্রথম পাতায়। প্রশাসন নড়েচড়ে বসল। পুলিশকে বেরতেই হল লোকটার খোঁজে শীতেলু সন্ধ্যায় শহরের গলি-ঘুপচি-রাজপথ জুড়ে চলল পুলিশী তল্লাশি সেও আরেক মানুষকে সন্ত্রস্ত করে। 

আদালত কক্ষটিতে তখন ভনভন করছে ভিড়। বাইরেও বহু লোক। সবাই দেখতে চায় কে কাকে ঠেলে গুঁতিয়ে লোকটাকে। প্রচুর পুলিশ পাহারায় যেন ভি আই পি সমাদর,গটগট করে তাকে কাঠগড়ায় তোলা হলে সরকারি উকিল বিচারককে বললেন, স্যার, আমি আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই। আমাকে অনুমতি দেওয়া হোক। 
অনুমতি দেওয়া হল। 
আপনার নাম ? সরকারি উকিল জানতে চাইলেন। 
ভুলে গেছি। 
নিজের নাম ভুলে গেছেন ? ইয়ার্কি হচ্ছে ? প্যান্টের বেল্ট আরেক ঘর বাড়িয়ে বেঁধে সরকারি উকিল বললেন। 
বাপের নামও ভুলে গেছি হুজুর, বিচারকের দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল। 
কেউ নিজের নাম, বাপের নাম ভোলে নাকি ! সরকারি উকিল পুনঃ। 
এদেশের কোটি কোটি মানুষকে জিগেস করুন, দেখবেন অনেকেই বলতে পারছে না। অবস্থা অনেককিছুই ভুলিয়ে দেয়। 
পুলিশের চার্জশিটে কী নাম দেওয়া আছে, বিচারক জানতে চাইলেন। 
স্যার, ওখানেও কোনো নাম নেই, শুধু লেখা আছে নাঃ, নেই, যা-র লোকটা। 
কী আশ্চর্য ! এটা কোনো নাম হল ? ঠিক আছে, এগোন। 
তুমি তো হে কারো পকেটেও হাত দাওনি, না খুন করেছ কাউকে। অথচ একটা ধারালো দা হাতে নিয়ে লোককে দাঁড় করিয়ে বলতে ঘুরতে ! কেন ? কারণটা বল। 
আমি লোকেদের হোগা দেখতাম হুজুর,লোকটা জানাল। 
হোগা ? হোয়াট ডাজ হোগা মিন ? হোগা কাকে বলে ? ক্ষেপে গিয়ে সরকারি উকিল। 
হোগা মানে পোঁদ হুজুর। আমি নাগরিকদের পোঁদ দেখতাম। 
পোঁদ শব্দটা গ্রাম্য। ওতে গুয়ের গন্ধ আছে। তুমি গাঁড় বল। গাঁড়ে গুয়ের গন্ধ থাকে না। তুমি এখন আদালত কক্ষটিতে আছ। এটা ভুলে যেও না,
সরকারি উকিল জানতে চাইলেন, তুমি কি গ্রামের লোক ? 
তোমার উকিল নেই, বিচারক জিগেস করলেন। 
উকিলদের খাই মেটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয় হুজুর। 
তোমাকে যা জিজ্ঞেস করা হবে হ্যাঁ অথবা না-তে উত্তর দেবে। তোমার বাড়তি কথা বলবার জায়গা এটা নয়, সরকারি উকিল বললেন। 
আপনি পারবেন সব প্রশ্নের উত্তর শুধু হ্যাঁ অথবা না-তে বলতে, লোকটা প্রশ্ন করল। 
প্রশ্ন তুমি নও, আমি করব, উত্তর দেবে তুমি। 
বলুন হুজুর, আর কী জানতে চান ? 
তুমি লোকেদের গাঁড়ে কী দেখতে ? 
বাঁড়া আছে কিনা হুজুর। ঢোকানো।  
লে ল্যাওড়া ! স্যার, লোকটা আমাকে এনটাইস করছে যাতে আমি নিজেকে নিজের ভেতরে...তুমি লোকেদের গাঁড় দেখতে ? তুমি হোমিনিড না হোমো ? 
আপনি তো হুজুর না হোমিনিড বোঝেন না হোমো।     
আপনি তো মশাই খিড়কিতেই ঘুরঘুর করছেন। সদরে আসুন, সরকারি উকিলকে বললেন বিচারক। 
ও হ্যাঁ স্যার, ঠিকই তো স্যার, সদরের দরজা কেউ খুলে দিলে আমরা খিড়কিতে ভিড় জমাব কেন ? আসলে আসামি আমাদের খিড়কিতেই আটকে রাখতে চাইছে স্যার। দেখতে উস্কোখুস্কো হলে কী হবে, মাল বহুত সেয়ানা স্যার। তবে আমিও সেয়ানাগিরিতে ওর বাঁড়া থুড়ি ইয়ে মানে বাড়া স্যার, চন্দ্রবিন্দুটা মিসটেকেন স্যার। আচ্ছা কার ইয়ে তুমি আছে কিনা দেখতে মানে ঢোকানো ? 
নাগরিকদের পোঁদে তো একটা বাঁড়াই ঢোকে আর সেটা রাষ্ট্রের। 
এ মালটা বলে কী ! ধর, তুমি সেটাকেই দেখলে। কী করতে তখন ? 
এক কোপে নামিয়ে দিতাম আর কী। 
এ পিসটা তো আসলেই পাগল স্যার, বিচারকের দিকে ফিরে সরকারি উকিল বললেন। 
আমারও তাই মনে হয়েছে। ফলে এই জিজ্ঞাসাবাদ আর না বাড়িয়ে আমি এক্ষুনি রায় জানিয়ে দিচ্ছি, বিচারক বললেন, পাঁচ মিনিটের জন্য আদালত মুলতবি ঘোষণা করা হল। 

গোটা আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ। একেকটা সেকেন্ড মনে হচ্ছে মিনিট আর একেকটা মিনিট যেন ঘন্টা। বাইরেও জনতা কান খাড়িয়ে কী হয় কী হয় অপেক্ষায়। পাঁচ মিনিট পরে বিচারক ফের ফিরে এসে জানালেন, যেহেতু আসামী কারো কোনো ক্ষতি করেনি, ছিনতাই বা খুন, এমনকী প্যাদায়ওনি কাউকেই, একটা আঁচড় পর্যন্ত না, শুধু একটা ধারালো দা নিয়ে ঘুরছিল আর লোককে দাঁড় করিয়ে তাদের পেছনটা দেখেই ছেড়ে দিচ্ছিল, এমন ঘটনা সরকারি উকিল বা আমার সঙ্গেও হতে পারত, যদিও আমি তো গাড়িতেই যাতায়াত এবং ফলে সে সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে, বরং সরকারি উকিল শুনেছি সাইকেলেই যাতায়াত করেন,ওর যাতে মাইনে বাড়ে সেটা আমি দেখব, তাই আসামী ওকে থামিয়েই ওর পেছনটা দেখে নিতেই পারত,তবে আমি নিশ্চিত আসামীর সেই অভিজ্ঞতা সুখকর হোত না, ওর প্যান্টের পেছনে হলুদ দাগ আমিও মাঝেমধ্যে দেখেছি, কিন্তু সেটা কিসের তা আমি বলতে পারব না,তবে আসামী যে ছোঁয়াচে সেটা বোঝাই যাচ্ছে, নইলে উনি কোন হরিদাস পাল যে আমি ওর পেছনেই পড়ে আছি, আসল কথা হল কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ওই লোকটাকে নিয়ে,যাকে প্রায় বিনা অপরাধে কিংবা শুধুই একটা দা নিয়ে ঘুরবার জন্য এবং লোকজনকে দাঁড় করিয়ে তাদের পেছন দেখবার জন্য যে পেছনটাকে আসামী প্রথমে হোগা বলে উল্লেখ করেছিল,পরে পোঁদ,সরকারি উকিল তাতে গুয়ের গন্ধ থাকবার কথা বলেছিলেন, শুধু সেজন্যই আমি আসামীকে ফাঁসি কিংবা জেল কোনটাই দিতে পারি না, দিলে বিচারের অমর্যাদা হবে, তাই আসামীর মানসিক শুশ্রূষার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি এবং তাকে কোনো ভাল মানসিক হাসপাতালে পাঠাবার নির্দেশ দিচ্ছি এবং তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবেন সরকার। 

অপেক্ষমান জনতা কেন হুররেএ বলে উঠল সেটা অবশ্য বোঝা গেল না এবং এদের মধ্যে সরকারি উকিলও ছিলেন।                                                                                                                                          

     -------------------------------------------------------------------------------------                                                                                                  
                                                                      

৩টি মন্তব্য:

ধারাবাহিক উপন্যাস

১৩. অনিমেষ একটা সিগারেট থেকে আর একটি সিগারেটে চলে যেতে যেতে একটা নুতন লেখা শুরুর কথা ভাবে। বেসিকালী সে ভেতরে ভেতরে একটা লেখাই লিখছিল।সিগারেট...