চা পাতা ৯৯

 



সম্পাদকীয়

সত্য কথা সত্য কথার মতোই।  সে সহজ হয়েও সহজ নয়। সরল তবু ভেদ্য নয়। নরম হয়েও ছেদ্য নয়। বললেই বলা যায় তবু কেউই সহজে বলতে চায় না।

অপ্রিয় সত্য বলতে নেই। কিন্তু মানুষ সবকিছুকে এতটাই মিথ্যে করে তুলেছে যে অপ্রিয় ব্যাপারগুলোই একমাত্র সত্য হয়ে রয়ে গেছে। সুতরাং সত্য বলতে হলে এখন অপ্রিয় সত্য বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই।


************************************************


কবিতা

কমল সরকার

ক্ষত

উপশমে ঢেকে থাকা কবেকার গোপন ব্যথা,
তুমি কেন দেখা দিলে ফের?
এখন কেমন দেখো ফুলের লালের মতো তেতে গেল
ছাইচাপা তুষের আগুন ;

ধুলো মেখে পড়ে থাকা পুরোনো সেতারে
একটা সন্ত্রস্ত ইঁদুর দৌড়ে গিয়ে যেন
বেজে উঠল অবোধ্য ঝংকার!

এই অসহ দহন
এই অস্থির মূর্চ্ছনা
আমার শরীর থেকে সমস্ত খোলস খুলে ফেলে
আমাকে আবারও করে তুলছে
ভীরু ও নির্বোধ।

অভিমানে ডুবে থাকা নিবিড় প্রত্যাখ্যান!
তুমি তো বরাবর জানো —

ও ভালো আছে জেনে আমি ভালো নেই
ও ভালো নেই জেনে আমি ভালো নেই

***************************

অরণ্য আপন

সুপ্রিয়া দে

ফেলে দেওয়া ওরসের আলুর ঘাটির মতো আছি পড়ে
দুপুরের ছায়ায় প্রথম দেখেছিলাম তোমাকে--- এইটুকু শুধু আজ মনে আছে
বুকের বাতাস প্রথম প্রেমের স্বাদ নিয়ে তোমার ঘ্রাণে উঠেছিল ভরে
কোন পথে যাব? তোমার চোখ চেয়ে থাকে সাবগ্রামের প্রতিটা গাছে
কোথায় সে হারাল আমাকে না বলে কোন সুখের পাছে
এখানে আকাশ হয়ে গেছে তোমার মতো, চোখ খুলতে পারি না
রুকু শেষে সেজদায় যাওয়ার মতো এ জীবন যেতে চায় তোমারই কাছে
অন্ধকার হয়ে আছ চারদিকে--- আলো জ্বালাতে আমি জানি না

চকবোচাই ধরে যাওয়া অটো রিকশাটা আজ মনে হয় কত কাছের
পাখির চোখের মতো তোমার মন কত ভাষা জানে
তোমাকে ছেড়ে আসা খড়েযানের বাতাস কথা বলে ঢের
জানা ছিল না হৃদয় ভুলে যেতে তুমি এতটা মাহের
মাখরাজ ভুল হয়েছে, ঠিকমতো পড়তে পারিনি তোমার মনের জবর যের

****************************************

দেবব্রত রায়

অথমাটিকথা

এরোপ্লেনগুলো এরোপ্লেনের কবিতা লেখে , মোটরসাইকেল,বাইসাইকেল এবং প্রান্তিক নাট-বল্টুগুলোও লেখে সবকিছু তাদের মতন করেই 

নুন আনতে পান্তা ফুরনো উঠোনে কেউ কেউ কবিতা লেখে একটি তোবড়ানো টুটোফুটো বাটির যার কোনো একটি ফুটো মেরামতি করতে গেলে নিশ্চিতভাবেই সেখানে আরো কয়েকটা ফুটোর শিং গজিয়ে ওঠে 
এ-রকমই অনন্ত ফুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়া লাভের গুড়টুকু ডেঁয়োপিঁপড়েরাই নিঃশেষে নিজেদের বাসায় তুলে নিয়ে যায়
উড়ো-যানগুলো যতটা তাদের ডানার অহংকার মিশিয়ে আকাশে ওড়াউড়ি করে তার সিকিভাগ ভরসাও তারা চাকার উপর রাখে না কিন্তু, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলগুলো জানে, গুড়ের গন্ধমাখা টুটোফুটো বাটির মেঠো উঠোনের উপর দিয়ে চাকা না-গড়ালে শুধুমাত্র, ডানার ভরসায় আকাশ ছুঁয়ে থাকা একেবারেই অসম্ভব
ঘিনঘিনে পাঁকেই হেসে ওঠে কোনো কোনো বাঙালির জাতীয়-উৎসব

   ****************************************

শিঞ্জন গোস্বামী

 কিছুদূরে

ভাঙ্গা পথ ছিল চশমাও কিছু ভাঙ্গা
দূরে জল দেখে ঠাওর করেছি ডাঙ্গা

ডাঙ্গা ভেঙ্গে আমি অতীতের অধিবাসী
তোমার দুচোখে আশ্রয় নিতে আসি

কারা  ঠাঁই দেবে সাদা হাড়ে চোখ রেখে?
আড়াল করবে প্রতিধ্বনির থেকে?

স্মরণে, ধুলায় আশরীর নতজানু
‘পলাতক’ লিখে ঘুমিয়ে পড়েছি আঙুল

ঠোঁটে উঠে আসে আয়নার দ্যাখা পেলে
প্রেতের শিয়রে চিহ্ন রেখেছ জ্বেলে

শিরা কেটে আজ আকাশ করেছো রাঙা

কিছুদূরে জল, পরিচয়হীন ডাঙ্গা…


************************

সুস্মিতা সাহা
অনুভব

চুপ ! একদম স্থির !
স্থানুবৎ হয়ে দাঁড়াও ওই টিলায়৷
এগোবেনা আর একদমই;
আমিও আর দূরে যাব না৷

এই সমান্তরাল রেখায় দাঁড়িয়ে
আপনি থেকে কেমন তুমি করা যায় অনায়াসে
দেখ ৷
আর ভিত আলগা হবে না
আর মাটি খসবে না ঝুরঝুর ঝুরঝুর

এভাবেই কবিতা পড়তে পড়তে
গাছজন্ম হবে দু'জনের ৷
মুখ ফিরিয়ে মজ্জারা মেখে নিতে থাকবে
কিছু গোপন স্বীকৃতি৷


******************************

নাদিরা

ঘুম

আমাদের মাঝের নদীতে জল কমে আসছে
উপেক্ষা গিলতে গিলতে দূরত্ব বেড়ে যায়,
সকালের সূর্যের মতো হলুদ পাতারা সহজে ঝরে পড়লে ;
ঘুমের মতো আত্মহত্যাকেও সহজ মনে হয়।

এখন বন্যা এলেও বাঁধ ভাঙার কোনো শব্দ হয়না
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে গিয়ে অনুভূতিহীন অভিব্যক্তি পেয়েছি,
একদিন এইভাবে  কান্নাগুলি সরে গিয়ে ঢিবি হয়
নীরব ঘৃনার নিস্পন্দ অপেক্ষার পর হঠাৎই পাহাড় হয়ে ওঠে।
হয়তো এইভাবে চূড়াগুলি এতো কঠিন পাথুরে শীতল হয় ,
আমাদের পায়ের রক্তের দাগ লাগলেও সেই মাটি ঘুমিয়ে থাকে ;
তীব্র অপেক্ষার ভেতর এইভাবে ভালোবেসে ঘুঘুরা শীতঘুমে যায়।
আমরা ভীষণভাবে মৃত পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে চাই...
আদতে তারা নিজের উত্তাপে পুড়ে খাক হয়ে গেছে।


*****************

গদ্য

উদয় সাহা

' ঝোলা গুড় দিয়া চিতই / কী সোয়াদ রে বাপোই '


আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল। এরপর শহরে বৃষ্টি নামলো। অসময়ের বৃষ্টি। অঋতুর বৃষ্টি। এইদিকে সর্বত্র পাতাহীন গাছ। কেমন ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ গাছেদের শরীর থেকে শুরু করে যে কটি পাতা অবশিষ্ট তাতে একটা ধুলো মাখামাখি অবস্থা। বৃষ্টি হলে এসব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ জমে যায় আপামর বাঙালির পৌষসংক্রান্তির দিন।

শৈশবে পৌষসংক্রান্তির দিনটি কেটেছে মামাবাড়িতে। আগের দিন চাল ভিজিয়ে রাখা হত৷ কুচকুচে কালো হামানদিস্তার পেটে ধবধবে সাদা চাল লাফিয়ে উঠে সাদা পাউডার হয়ে যেত৷ পরদিন সকালে সূর্য ওঠার ঠিক আগে পুব-মুখ করে চালের গুঁড়ো গুলে তা দিয়ে সূর্য এঁকে নয়টা গাঁদা ফুল, ধান- দূর্বা, তিল,জল দিতে হত ৷ ছোটমামা এই দুরূহ কাজটি করত অত ভোরে উঠে স্নান করে৷

মধ্য সত্তরের পুষ্পরাণী সাহা। আমার দিদিমা। বলছিলেন  কনকনে ঠান্ডার দুপুরে রোদ্দুরে পীঠ দিয়ে বসা আর পৌষ পার্বণে পিঠে পুলির গল্প। তিনি বলেন, ‘‘অহন তো শুধুমাত্তর নিয়ম রক্ষার লিগা সামান্য একটু পিঠা বা পায়েস তৈরি হয়। ওপার বাংলার ঢাকা, বরিশাল বা যশোরের সব গ্রামের পৌষ পার্বণের সকালডা অন্য রকম ছিল। অহন হজ্ঞলই শুধু স্মৃতি "। দিদার হাতে চিতই পিঠে, নতুন গুড় আর দুধ দিয়ে তৈরি 'দুধ চিতই' ভাগ্যিস খেয়েছিলাম ! আসলে ঠাকুমার বাড়িতে পৌষসংক্রান্তির দিনটি একটু অন্যরকম৷ দই, চিড়ামুড়ি, পায়েস, নতুন দেশি আলুর ঘুগনি, তিলা কদমা, খিচুড়ি প্রভৃতি দিয়ে নিয়ম পালন করা হয়৷

'সংক্রান্তি' অর্থ সঞ্চার বা গমন করা৷ শব্দটি বিশ্লেষণ করলেও একই অর্থ পাওয়া যায় ;  সং অর্থ সঙ সাজা এবং ক্রান্তি অর্থ সংক্রমণ। অর্থাৎ ভিন্ন রূপে সেজে অন্যত্র সঞ্চার হওয়া বা গমন করাকে বোঝায়। বাস্তবেও তাই দেখা যায়। ক্যালেন্ডারে মাঘের যাত্রা শুরু হলে বাতাসে যখন কুয়াশার সঘন চাদর তখন ব্যাপারটা এমন হয়ে যায় যেন - ' ঝোলা গুড় দিয়া চিতই / কী সোয়াদ রে বাপোই '।

ইদানিং আয়োজন হচ্ছে ‘প্ৰি ভোগালি মেলা’, ‘পৌষ সংক্ৰান্তির খাদ্য উৎসব’ যেখানে রাজ্যের বিভিন্ন গ্ৰামগঞ্জ থেকে মহিলারা চোখের সামনেই পিঠে পুলি  তৈরি করে দিচ্ছেন। তবুও মাঝে মধ্যে মন খারাপ করে চোখ ভিজে আসে। মনে হয় একদিন গ্রামবাংলার এই প্রাণের উৎসবটি হয়তো চিরতরে হারিয়েই যাবে। কারণ বর্তমান ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলার পুরানো কোনও লোকসংস্কৃতি উৎসবগুলো কোনমতেই খাপ খেয়ে থাকতে পারবে না হয়ত ! এটাই মনে হয় বাস্তব। এটাই মনে হয় ভবিতব্য ৷

পঞ্চাশোর্ধ বিধবা মা সেদিন যখন চাদর গায়ে শীতের সন্ধ্যায় মাটির সরায় চালের গুঁড়ো দিয়ে চিতই পিঠে ভাজছিলেন, বালক তখন এসবই ভাবছিল আর দিব্য শুনতে পাচ্ছিল সেই ডাক, ' বাবা, ব্যাগটা ধরো তো, আর মাকে দেখে নিতে ব'ল সব ঠিক আছে কিনা... '


*****************************

চা- পাতা 

৯৯ তম সংখ্যা

প্রচ্ছদ - ইন্টারনেট

সম্পাদনা- তাপস দাস


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চা- পাতা ৯৩

চা-পাতা ৯১

চা- পাতা ৯৫